মঙ্গলবার ১০ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
ফিচার

চাঁদাবাজি নাকি সমঝোতা?

ফেরারি মিজান ০৮ মার্চ ২০২৬ ১১:০৮ পি.এম

চাঁদাবাজি নাকি সমঝোতা? প্রতীকী ছবি

সমাজে এমন কিছু শব্দ আছে, যেগুলো একসময় মানুষের সহযোগিতা, মানবিকতা ও সামাজিক ঐক্যের প্রতীক ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই শব্দগুলোর ব্যবহার ও অর্থের ভেতরে ঘটে যায় অদৃশ্য রূপান্তর। “চাঁদা” শব্দটি তেমনই একটি শব্দ। একসময় এটি ছিল সম্মিলিত উদ্যোগের শক্তি, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতীক। অথচ বর্তমান বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই এই শব্দটি মানুষের মনে ভয়, অস্বস্তি ও প্রশ্নের জন্ম দেয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এটি কি সত্যিই চাঁদা, নাকি চাঁদাবাজির আরেক রূপ? নাকি আমরা এটিকে সমঝোতার নাম দিয়ে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি?

চাঁদা মূলত এমন একটি সামাজিক প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট কল্যাণমূলক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য মানুষের কাছে সহযোগিতা কামনা করে। এককভাবে কোনো কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে সমাজের মানুষ একত্রিত হয়ে সেই দায়িত্ব ভাগ করে নেয়। এই সহযোগিতা হতে পারে অর্থের মাধ্যমে, শ্রমের মাধ্যমে, কিংবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে। মূল বিষয়টি হলো—এটি স্বেচ্ছাসেবী। কেউ ইচ্ছা করলে অংশ নেবে, না চাইলে তাকে বাধ্য করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

আমাদের সমাজে বহু ইতিবাচক কাজই এই চাঁদার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, অসহায় মানুষের সহায়তা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ—এসব ক্ষেত্রেই চাঁদা মানুষের পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সামাজিক ঐক্যের প্রতিফলন হিসেবে কাজ করেছে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি ছোট উদ্যোগও যখন সবার অংশগ্রহণে বড় হয়ে ওঠে, তখন সেই সাফল্যের পেছনে থাকে এই সম্মিলিত সহযোগিতার শক্তি।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই স্বেচ্ছাসেবী সহযোগিতা ধীরে ধীরে বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যের কথা বলে মানুষের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা হয়। কখনো দলবদ্ধভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়, কখনো সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়, আবার কখনো ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়। তখন আর সেই অর্থ প্রদান স্বেচ্ছায় থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে এক ধরনের চাপের ফলাফল।

এই পরিস্থিতিকেই আমরা সাধারণত “চাঁদাবাজি” বলে থাকি। চাঁদার সঙ্গে যখন জোরজবরদস্তি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভয়ভীতির উপাদান যুক্ত হয়, তখন তা আর সহযোগিতা থাকে না—বরং তা এক ধরনের অনৈতিক আদায়ে পরিণত হয়। এর ফলে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস জন্ম নেয়, সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একটি ইতিবাচক সংস্কৃতি ধীরে ধীরে কলঙ্কিত হয়ে যায়।

তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। অনেক সময় মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ না করে পরিস্থিতির সঙ্গে আপস করে। কেউ নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে, কেউ সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য, আবার কেউ অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা এড়ানোর জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও অর্থ প্রদান করে। তখন অনেকেই এই ঘটনাকে “সমঝোতা” বলে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—এই সমঝোতা কি সত্যিই স্বতঃস্ফূর্ত, নাকি এটি ভয়ের কারণে গৃহীত এক নীরব মেনে নেওয়া?

প্রকৃতপক্ষে সমঝোতা তখনই অর্থবহ, যখন তা দুই পক্ষের স্বাধীন সিদ্ধান্তের ফল। কিন্তু যখন এক পক্ষের ওপর চাপ থাকে এবং অন্য পক্ষ সেই চাপের সুযোগ নিয়ে সুবিধা আদায় করে, তখন সেটিকে সমঝোতা বলা যায় না। সেটি মূলত অন্যায়ের কাছে নীরব আত্মসমর্পণ।

এই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—শব্দের নিজস্ব কোনো দোষ নেই। দোষ মানুষের আচরণে এবং ব্যবহারে। একটি ভালো ধারণাকে আমরা যদি সৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করি, তবে তা সমাজে কল্যাণ বয়ে আনে। কিন্তু সেই একই ধারণাকে যদি ক্ষমতার অপব্যবহারের হাতিয়ার বানানো হয়, তবে সেটিই সমাজে ভয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

সুতরাং আমাদের প্রয়োজন বিষয়টির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করা। স্বেচ্ছাসেবী সহযোগিতার সংস্কৃতিকে আমরা অবশ্যই সম্মান করব এবং তা বজায় রাখার চেষ্টা করব। কিন্তু জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে সচেতন ও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। কারণ একটি সুস্থ সমাজ কখনো ভয় বা চাপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না; সেটি দাঁড়িয়ে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতার ভিত্তির ওপর।

সবশেষে প্রশ্নটি তাই আবারও সামনে এসে দাঁড়ায়—আমরা কি সত্যিই সহযোগিতার সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, নাকি চাঁদাবাজিকে “সমঝোতা” নাম দিয়ে তাকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করে তুলছি? সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নের সৎ উত্তর খুঁজে পাওয়ার ওপর।

লেখক: ফেরারি মিজান
মেইল ferarimijan1@gmail.com


এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

চাঁদাবাজি নাকি সমঝোতা?

news image

পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি ও ভারতের রাষ্ট্রীয় সংহতির ভবিষ্যৎ

news image

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নৈতিকতার সংকট—সময় কি আত্মসমালোচনার?

news image

রাজনীতি, বুদ্ধিজীবী ও টকশো-সংস্কৃতি: বিভ্রান্ত এক দেশ

news image

পেশা নয়, সেবা—এটাই হোক রাজনীতি

news image

যেসব লক্ষণে বুঝবেন আপনার থেরাপি প্রয়োজন

news image

ইসলামিক রাজনীতি বনাম গণতান্ত্রিক রাজনীতি: মুসলমানদের অন্তর্দ্বন্দ্ব

news image

শারীরিক ও মানসিক সুস্থ থাকতে দরকার আলিঙ্গনের

news image

সঙ্গী নার্সিসিস্ট কি না চিনবেন যেভাবে

news image

৬ উপসর্গে এআই নয়, চাই সরাসরি চিকিৎসক

news image

এসিতে বিস্ফোরণ? এই ৫টি সংকেত কখনোই উপেক্ষা করবেন না!

news image

যেভাবে বুঝবেন আপনার বিশ্রাম দরকার

news image

বছরের শেষ সূর্যগ্রহণ আজ

news image

৪৩০ জনকে নিয়োগ দেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, লাগবে এসএসসি পাস

news image

বাংলাদেশের স্বৈরতন্ত্রের ইতিহাস ও পি আর পদ্ধতির প্রযোজ্যতা

news image

জাপানিদের দীর্ঘ ও সুখী জীবনের রহস্য

news image

"একাত্তরের অর্জিত নামমাত্র স্বাধীনতা"

news image

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শকে বিতর্কিত করতেছে কারা?

news image

সোলো ট্রিপের জন্য ঘুরে আসুন এই ৫টি দেশে

news image

পুরো মানুষ গিলে ফেলতে সক্ষম যে ৬টি ভয়ংকর প্রাণী

news image

চন্দ্রগ্রহণ খালি চোখে দেখা কি নিরাপদ?

news image

খোলা চিঠি

news image

দামাল কবির জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানিয়ে মঞ্চে আবারো ‘দামাল ছেলে নজরুল’

news image

তারেক জিয়ার উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি

news image

রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় নির্বাচন ব্যবস্থা!

news image

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্রয়াণ দিবসে সুরেলা সন্ধ্যা

news image

রবিন রাফানের এআই মাস্টারক্লাসে অভূতপূর্ব সাড়া, দ্বিতীয় সিজনের ঘোষণা

news image

যেভাবে অনলাইনে ভাইরাল হওয়া কারওয়ান বাজারের তরমুজ বিক্রেতার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো

news image

ঈদ সালামি থেকে ঈদী: সংস্কৃতির বিবর্তন

news image

সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ৪০০ বছরের পুরোনো মসজিদ