বুধবার ১৭ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
জাতীয়

যে কারণে শিবিরের ভূমিধস জয় আর ছাত্রদলের বিপর্যয়

নিজস্ব প্রতিবেদন ১১ সেপ্টেম্বার ২০২৫ ০৫:৫৮ এ.এম

যে কারণে শিবিরের ভূমিধস জয় আর ছাত্রদলের বিপর্যয় ছবি: সংগৃহীত

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। ইতিহাস গড়ে এ নির্বাচনে অধিকাংশ পদে জয় পেয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীরা। অন্যদিকে, বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল পড়েছে ইতিহাসের অন্যতম বড় ধাক্কায়। শুধু পরাজয় নয়, অনেক পদে দ্বিতীয় স্থানেও পৌঁছাতে পারেননি তাদের প্রার্থীরা।

দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্বহীনতা এবং শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুধাবনে ব্যর্থতা—এসবই ছাত্রদলের বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। তাদের মতে, ক্যাম্পাসে স্থায়ী উপস্থিতি না থাকা, সারা দেশে বিএনপির কিছু নেতার অরাজনৈতিক আচরণ, দুর্বল প্রচার এবং বিভক্ত নেতৃত্ব শিক্ষার্থীদের আস্থাহীন করে তুলেছে সংগঠনটির প্রতি। অন্যদিকে, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরপরই নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে সচেষ্ট হয় ইসলামী ছাত্রশিবির। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে নানা কর্মসূচি, আহতদের পাশে দাঁড়ানো এবং শিক্ষার্থীবান্ধব কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা দ্রুত আলোচনায় আসে। প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও নতুনত্ব দেখিয়েছে সংগঠনটি। নিজেদের পরিচিত নেতৃত্বের বাইরে গিয়ে তারা নারী শিক্ষার্থী, জুলাই আন্দোলনে আহতদের প্রতিনিধি এবং সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীকে প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করে চমক দেখিয়েছে। এই বহুমাত্রিক কৌশল দাগ কেটেছে শিক্ষার্থীদের মনে। প্রচারণায় তারা সংগঠিত ও সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রেখেছে। প্রতিটি হল এবং বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে তাদের বার্তা। এর প্রতিফলন মিলেছে নির্বাচনের ফলে।

ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও বহুল আলোচিত বিষয়। যদিও শেষ পর্যন্ত মতপার্থক্য ও গ্রুপিংয়ের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকাশ্যে সবাই প্রচারে নেমেছিলেন। তবে সেই প্রচার ছিল একেবারেই সাদামাটা; কোনো অভিনবত্ব ছিল না। শিক্ষার্থীদেরও মন ছুঁতে পারেনি। ডিজিটাল প্রচারণাতেও সাড়া ফেলতে ব্যর্থ হন ছাত্রদলের প্রার্থীরা। ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান, জিএস প্রার্থী তানভীর বারী হামিম এবং এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদ কিছুটা নিজেদের তুলে ধরতে পারলেও বাকি প্রার্থীরা ছিলেন আড়ালে। এ ছাড়া পুরো প্যানেলের সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা ছিল না; সবাই আলাদা প্রচারে সীমাবদ্ধ ছিলেন।

এই নির্বাচনে ছাত্রদলের প্রার্থীরা ছিলেন পরিচিত মুখ। আবিদুল জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে আলোচিত নাম, হামিম জুলাই আন্দোলনে তুমুল সক্রিয় থাকার পাশাপাশি গত এক বছর ক্যাম্পাসজুড়ে নানা সেবামূলক কাজে সক্রিয় ছিলেন। মায়েদও আন্দোলনসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন নানা ইস্যুতে। কিন্তু সমস্যা হলো, ২০ আগস্ট পর্যন্ত তারাও জানতেন না যে, তারা ডাকসুর প্রার্থী হচ্ছেন। ফলে শেষ সময়ে প্রার্থী ঘোষণা হলেও নিজেদের যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারেননি।

অন্যদিকে, গণঅভ্যুত্থানের পরপরই ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বিরোধী হাওয়া বইতে শুরু করে। শিক্ষার্থীদের মনে ভর করে বসে অতীতের ‘গেস্টরুম-গণরুম’ সংস্কৃতির স্মৃতি। এই পরিস্থিতিতেই হলে হলে ছাত্রদলের হল কমিটি ঘোষণা করা হয়, যা সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে নেননি। বরং অনেকেই এর প্রতিবাদ করেছিলেন। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর নেতিবাচক কার্যকলাপও ডাকসুর ভোটে প্রভাব ফেলে। এমনকি কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার ‘বেফাঁস’ মন্তব্যও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রদলবিরোধী মনোভাব তৈরিতে সহায়তা করেছে বলে মনে করেন অনেক শিক্ষার্থী।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্যাম্পাসে অন্যান্য সংগঠনের তুলনায় শিবির অনেক বেশি সুসংগঠিত ছিল। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের দিয়ে কমিটি গঠন করায় প্রায় প্রতিটি নেতারই ছিল সরাসরি যোগাযোগ। ক্যাম্পাসে সমস্যার সময়ে সহায়তা করা থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক ও একাডেমিক আয়োজনেও তাদের দৃশ্যমান ভূমিকা শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখে।

প্রায় এক বছর আগে থেকেই ডাকসুকে কেন্দ্র করে শিবির পরিকল্পনা সাজায়। শিক্ষা-সহায়ক কার্যক্রম, চিকিৎসা সহায়তা, রক্তদান, ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতা, গণঅভ্যুত্থানে আহতদের পাশে দাঁড়ানোসহ নানামুখী কর্মসূচির মাধ্যমে তারা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছায়। এসব সেবামূলক কার্যক্রম শুধু সমর্থকদের নয়, নিরপেক্ষ অনেক শিক্ষার্থীকেও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলে।

শিবির নেতাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় চার হাজার ‘রিজার্ভ ভোটার’ রয়েছে তাদের। এ ছাড়া অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন, যারা তাদের কর্মসূচি থেকে উপকৃত হয়েছেন বা সহানুভূতিশীল ছিলেন। এসব ভোটারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিবির নির্বাচনে বড় ব্যবধানের জয় পায়।

প্রার্থী মনোনয়নেও নতুনত্ব দেখায় শিবির। শীর্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি তারা নারী শিক্ষার্থী, জুলাই আন্দোলনে আহত প্রতিনিধি এবং সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীকে প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করে। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল শিক্ষার্থীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেয় যে—ডাকসু শুধু একটি সংগঠনের নয়, বরং সবার।

ভিপি পদে নির্বাচিত আবু সাদিক কায়েম, জিএস পদে এস এম ফরহাদ এবং এজিএস পদে মুহাম্মদ মহিউদ্দীন খান—তিনজনই ছাত্রশিবিরের শীর্ষ পর্যায়ের পরিচিত মুখ। কায়েম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক। ফরহাদ বর্তমান সভাপতি এবং মহিউদ্দীন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গণঅভ্যুত্থানে কায়েমের সক্রিয় ভূমিকা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়, যা তাকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। একইভাবে জুলাই আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখেন ফরহাদ ও মহিউদ্দীন।

প্রচারণায়ও অভিনবত্ব আনে শিবির। প্রতিটি হল ও বিভাগে সমন্বিত টিমওয়ার্কের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়। নির্বাচনী বার্তা ও কর্মসূচি স্পষ্টভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। ডিজিটাল প্রচারণায়ও তারা এগিয়ে ছিলেন। কয়েকটি নির্বাচনী গান শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। প্রতিদিনের প্রচারণা কার্যক্রম ভিডিও আকারে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি অতীতের সেবামূলক কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ ইশতেহার নিয়েও ডিজিটাল প্রেজেন্টেশন প্রকাশ করা হয়। সব মিলিয়ে এই কৌশল সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং নির্বাচনে শিবিরের বিপুল জয়ের পথ প্রশস্ত করে।


এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

হাদি হত্যার প্রধান আসামি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যা জানালেন

news image

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের পাশ থেকে ৬টি সাউন্ড গ্রেনেড উদ্ধার

news image

গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারকে ভাতা দিতে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেব: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী

news image

দিল্লিতে মাহদী হাসানের সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল?

news image

পটুয়াখালী-৩ আসনে নুরুল হক নুর বেসরকারিভাবে জয়ী

news image

৯৩ কেন্দ্রের ফলাফল: বড় ব্যবধানে এগিয়ে মির্জা ফখরুল

news image

সুষ্ঠু ভোটে যে রেজাল্ট হোক আমরা মেনে নেব: জামায়াত আমির

news image

নির্বাচনের ফলাফল বিলম্বিত হওয়ার কোনো কারণ নেই: ইসি সচিব

news image

ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা, সেনাবাহিনীর হাতে বিএনপির ১৩ নেতাকর্মী আটক

news image

রেকর্ড গড়ছে ‘ত্রয়োদশ’ : ইতিহাসের সর্বোচ্চ দল ও প্রতীকের লড়াই

news image

শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ ভোটের পরিবেশ রক্ষার্থে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান সিইসির

news image

নির্বাচন ডাকাতি আর না ঘটে সেই ব্যবস্থা করতে হবে: প্রধান উপদেষ্টা

news image

‘মোন্থা’র প্রভাবে সারা দেশে ৫ দিন বৃষ্টির আভাস

news image

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শপথ

news image

এক দিনে আবার বাড়ল দেশের স্বর্ণের দাম

news image

সাবেক চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রেজাউল করিম বরখাস্ত

news image

সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ এস আলমের বিরুদ্ধে

news image

প্রথমবার বাংলাদেশে আসছেন জাকির নায়েক

news image

হাজার হাজার দেশপ্রেমিকের হত্যার নির্দেশদাতা ছিলেন হাসিনা: চিফ প্রসিকিউটর

news image

তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য ‘সোশ্যাল বিজনেস ফান্ড’ গঠনের আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

news image

ড. ইউনূসের সঙ্গে ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হবে কিনা, স্পষ্ট করলেন প্রেস সচিব

news image

শেখ হাসিনার বিচারকাজ সম্প্রচারের সময় সাইবার অ্যাটাক

news image

বিশৃঙ্খলাকারীকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

news image

ইতালির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করলেন প্রধান উপদেষ্টা

news image

সারাবিশ্ব দেখেছে বাংলাদেশ কী ভূমিকা রাখতে পারে

news image

আজ রোম যাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা

news image

সেন্ট মার্টিন-বঙ্গোপসাগর ঘিরে বড় শক্তির বিপজ্জনক খেলা

news image

রাজধানীতে হিট অফিসার বুশরার সিসা বার

news image

হাসিনার চিকিৎসকের ছেলে ও সাবেক মন্ত্রীপুত্রের সিসা বার খুলে দিতে তদবির

news image

রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে জুলাই সনদ সই হবে: ধর্ম উপদেষ্টা